ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসির) চারটি ওয়ার্ড (৩৮, ৩৯, ৪২ ও ৪৩) ঘেঁষে বয়ে গেছে সুতিভোলা খাল। স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্বিচারে ফেলা ময়লা-আবর্জনা ও কচুরিপানার নিচে এই খালে যে পানি আছে সেটাই বোঝা মুশকিল। সাঁতারকুল ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে উত্তর-দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় পুরো খালজুড়ে শুধুই ময়লা-আবর্জনা আর কচুরিপানা। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কয়েক দফা খাল পরিষ্কার করা হয়েছে। মেয়র আতিকুল ইসলাম নিজেও অংশ নিয়েছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে। কিন্তু সুফল মেলেনি। এলাকার লোকজনের কারণে আবারও নিজের পরিচয় হারিয়ে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে সুতিভোলা খাল। ডিএনসিসির উদ্যোগকে কোনও তোয়াক্কা না করে দখল-দূষণের উৎসবে ফিরে গেছে স্থানীয়রা। খালপাড়ে কোনও প্রাচীর না থাকায় প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। পরিচ্ছন্নতা ও সংস্কারের অভাবে এক সময়ের অতি প্রয়োজনীয় খালটির বেহাল অবস্থা এখন এলাকাবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খালের তীর ঘুরে দেখা যায়, খিলবাড়িরটেক থেকে সাঁতারকুল পর্যন্ত সিএস দাগ অনুযায়ী সুতিভোলা খালের অনেকাংশে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। ফলে খালের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। সাঁতারকুল ব্রিজ থেকে খালের সীমানা ঘেঁষে রামপুরা ব্রিজের দিকে যেতে চোখে পড়ে বালু দিয়ে ভরাট করে খালের সীমানা দখলের চেষ্টা চলছে।
এছাড়া এলাকার লোকজন এলোপাতাড়ি গৃহস্থালি বর্জ্য ও দোকানপাটের ময়লা-আবর্জনা বস্তায় ভরে সাঁতারকুল ব্রিজের ওপর থেকে খালে ফেলছে। অনেকে আবার খালের মধ্যে বাঁশের ঘেরা দিয়ে মাছ চাষ করছে। সিটি করপোরেশন থেকে দখলদারদের সরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও কেউই সিটি করপোরেশনের অনুরোধ আমলে নেয়নি। সাঁতারকুল পূর্ব পদরদিয়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব বলেন, একসময় আমাদের চলাচলের প্রধান পথ ছিল এই খাল। আমরা সাঁতারকুল থেকে রামপুরার ওখান থেকে কাওরানবাজার যেতাম নৌকায় করে। ধীরে ধীরে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে বলে খালে চলাচল কমে গেছে। খালে যাতায়াত কমতে কমতে আজ এই খাল আর খাল নেই। এটা এখন আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। দখলদারদের কবলে পড়ে এই খালের চেহারা বদলে গেছে। আগের চেয়ে দুই পাড় সংকুচিত হয়ে গেছে।
এই বাসিন্দা আরও বলেন, মেয়র আতিকুর ইসলাম একবার নিজে হাজির হয়ে এই খালের আবর্জনা পরিষ্কার করেছেন। কিন্তু ঘুরে-ফিরে এখন আবার আগের অবস্থা। মানুষ ময়লা আবর্জনা ফেলে পুরো খালের অবস্থা একটা ডোবার মতো করে ফেলেছে। সাঁতারকুলের দক্ষিণে আবার বালু ভরাট করে এই খাল দখল চলছে। অনেকে খালের ওপর দোকানপাট করেছে, বাড়িও করেছে। দখলদারদের দখলদারিত্ব বেড়েই চলেছে। তবে শুনেছি সব উচ্ছেদ করা হবে।
সাঁতারকুলের আরেক বাসিন্দা মো. রজত আলী (৬১) বলেন, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে আমাদের খালগুলো সচল করতেই হবে। গত বছর মেয়র আতিকুল ইসলাম খাল পরিদর্শন করেছেন এবং ময়লা আবর্জনা খাল থেকে অপসারণ করেছেন। খাল পরিষ্কার থাকলে আমগো মনটাও পরিষ্কার থাকে। এটা এলাকার জন্যই ভালো। আগে এই খালের পানি এত পরিষ্কার ছিল আমরা এখান থেকে পানি খাইতাম। আর এখন পানি খাওয়া তো দূরের কথা এখানে কতক্ষণ থাকলে দুর্গন্ধ বের হবে। বাসায় মশার জন্য টেকা যায় না। মশা তো থাকবেই, কারণ খালে সব ময়লা আবর্জনা ভরা, খাল অপরিষ্কার। এসব ময়লার ভেতরেই তো মশার জন্ম।
খিলবাড়িরটেকের বাসিন্দা হাশেম আলী বলেন, চোখের সামনে এই খালের দুর্দশা সইতে পারি না। মানুষের ফেলা ময়লা আবর্জনার কারণে এ খালের পাশ দিয়ে চলাফেরা করতে কষ্ট হয়। খাল থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ আর মশার উৎপাতে এখানে বসবাস করা কঠিন হয়ে গেছে। তাছাড়া প্রায়ই খালে মোটরসাইকেল, রিকশা, সাইকেল পড়ে যায়। কারণ খালের দু’পাশ উন্মুক্ত। বর্ষাকালে এই দুর্ঘটনা আরও বেড়ে যায়। পুরো খালজুড়ে কোনও রেলিং নেই। বাচ্চারা স্কুলে আসা-যাওয়া করে। আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি, কখন কী দুর্ঘটনা হয়।
সুতিভোলা খালের অবস্থা সম্পর্কে জানতে ডিএনসিসির ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। কাউন্সিলর অফিস সূত্রে জানা যায় তিনি দেশের বাইরে আছেন। পরবর্তীতে ওই খাল সম্পর্কে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড সচিব রাসেল আহমেদ বলেন, এ খাল সংশ্লিষ্ট আরও চারটি ওয়ার্ড আছে, সেসব এলাকার ময়লা-আবর্জনাও মানুষ এই খালে ফেলে। অনেকে কারখানা এবং ফাইলিংয়ের ময়লাও খালে ফেলে। খালে ময়লা আবর্জনা না ফেলতে বিভিন্ন ধরনের প্রচার-প্রচারণা আমরা চালিয়েছি। তবু মানুষ কথা শোনে না। মেয়র আতিক এ খাল পরিদর্শন শেষে এর সংস্কার ও খালপাড়ে প্রাচীর নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান এই ওয়ার্ড সচিব।
গত বছরের ডিসেম্বরে বাড্ডার সুতিভোলা খাল সংস্কার করে হাতিরঝিল ও তুরাগ নদের সঙ্গে যুক্ত করা হবে বলে জানান ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। মেয়রের নির্দেশনার পর এই খালটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। মেয়র নিজেই এই খালে এসে নৌকায় উঠেছেন। কিন্তু তার কিছু সময় না যেতেই ফের কচুরিপানা আর মানুষের ফেলা গৃহস্থালি ও দোকানপাটের ময়লায় আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে খালটি। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে একদিকে উচ্ছেদ করলে আবার অন্যদিকে বালু ভরাট করে খাল দখল করেছেন দখলদাররা।
তবে মেয়র আতিক ডিসেম্বরে খাল পরিদর্শন করার সময় তখন দখলদারদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সুতিভোলা খাল সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করা হবে। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী খাল। কিন্তু আজ এই খালের পানিপ্রবাহ ঠিক নেই। দখল হয়ে আছে, আবর্জনায় ভরপুর। আমরা এ খাল পরিষ্কার করবো, জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি খালের পাশে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করবো। আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে এ খালের পাড় বাঁধানো এবং পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা। এই খালে আগের মতো নৌ-চলাচলের ব্যবস্থাও চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন মেয়র আতিক।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

ডিএনসিসি উদ্ধারে তৎপর থাকলেও বাধায় স্থানীয়রা
দখল-দূষণে বিলুপ্তপ্রায় সুতিভোলা খাল
- আপলোড সময় : ০৩-০৭-২০২৪ ১০:৩১:০৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-০৭-২০২৪ ১০:৩১:০৬ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ